খতিয়ান ঠিক কিন্তু নকশায় জমি বেশি—আইনগত প্রতিকার কী?

বাংলাদেশে জমি সংক্রান্ত বিরোধের মধ্যে একটি সাধারণ কিন্তু জটিল সমস্যা হলো—খতিয়ানে জমির পরিমাণ সঠিক থাকলেও মৌজা নকশা বা সরেজমিন পরিমাপে জমি বেশি দেখা যাওয়া। বিশেষ করে এস.এ (SA) থেকে আর.এস (RS) জরিপের সময় দাগ বিভাজন, জরিপজনিত ভুল (Survey Error), নকশাগত ত্রুটি (Map Error) অথবা মাঠ পরিমাপে অসামঞ্জস্যের কারণে এই ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, খতিয়ানে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি রেকর্ড আছে, কিন্তু নকশায় সেই দাগ বাস্তবে বড় দেখানো হয়েছে এবং পরিমাপেও অতিরিক্ত জমি পাওয়া যাচ্ছে। এতে জমির প্রকৃত মালিকানা, সীমানা এবং সরকারী খাস জমি নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়।

আইনের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র নকশায় জমি বেশি দেখা গেলেই সেই অতিরিক্ত অংশের উপর স্বয়ংক্রিয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না। কারণ বাংলাদেশের প্রচলিত ভূমি আইন অনুযায়ী খতিয়ান ও নকশা—উভয়ই সহায়ক দলিল মাত্র; কোনোটিই এককভাবে চূড়ান্ত মালিকানার প্রমাণ নয়। আদালত সাধারণত দলিল, CS/SA/RS খতিয়ান, মৌজা ম্যাপ, বাস্তব দখল, মাঠ পরিমাপ, খাজনা, সীমানা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ একত্রে বিবেচনা করে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করেন। যদি দেখা যায় যে অতিরিক্ত অংশটি পাশের সরকারী খাস জমি বা অন্য কারো জমি থেকে ভুলক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাহলে সেই অতিরিক্ত জমির উপর বৈধ মালিকানা দাবি করা যাবে না।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তির আর.এস খতিয়ানে ১২৫ শতাংশ জমি রেকর্ড আছে, কিন্তু আর.এস নকশা ও সরেজমিন পরিমাপে ১৪০.৩৬ শতাংশ জমি পাওয়া গেল। একইসাথে পাশের সরকারী ১ নং খতিয়ানের দাগে জমি কম পাওয়া যাচ্ছে। এই অবস্থায় ধরে নেওয়া যায় যে জরিপের ভুলে সরকারী খাস জমির কিছু অংশ ব্যক্তিগত দাগে চলে এসেছে। ফলে অতিরিক্ত ১৫.৩৬ শতাংশ জমি শুধুমাত্র বাস্তব দখল বা নকশার ভিত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানায় পরিণত হবে না। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ অনুযায়ী খাস জমি সরকারের সম্পত্তি এবং জরিপের ভুলে ব্যক্তিগত দাগে অন্তর্ভুক্ত হলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যক্তিগত মালিকানায় রূপান্তরিত হয় না।

এ ধরনের সমস্যার আইনগত প্রতিকার পাওয়ার জন্য প্রথমে একজন সনদপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ সার্ভেয়ার দিয়ে CS, SA, RS ও বর্তমান নকশা মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সার্ভে করানো অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে প্রকৃত সীমানা, অতিরিক্ত জমির উৎস এবং জরিপের ভুল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। এরপর যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে নকশায় ভুল হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস অথবা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে রেকর্ড ও নকশা সংশোধনের আবেদন করা যায়। যদি প্রশাসনিকভাবে সমাধান না হয়, তাহলে দেওয়ানি আদালতে ঘোষণামূলক মামলা (Declaratory Suit), সীমানা নির্ধারণ মামলা (Boundary Suit) অথবা রেকর্ড সংশোধন মামলা দায়ের করে আইনগত প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। আদালত তখন দলিল, খতিয়ান, পূর্ববর্তী রেকর্ড, বাস্তব দখল ও বিশেষজ্ঞ সার্ভে রিপোর্ট যাচাই করে প্রকৃত মালিকানা ও সঠিক সীমানা নির্ধারণ করেন।

অতএব, খতিয়ানে জমির পরিমাণ সঠিক থাকলেও নকশায় জমি বেশি দেখা গেলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ সামান্য জরিপগত ভুলও ভবিষ্যতে বড় ধরনের মামলা-মোকদ্দমা, সরকারী বিরোধ অথবা জমি হারানোর কারণ হতে পারে। তাই দ্রুত সঠিক সার্ভে, রেকর্ড যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর সমাধান।



এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

গাজীপুর ডিজিটাল ল্যান্ড সার্ভে শেখ শহীদুল ইসলাম স্বপন ঠিকানাঃ এস.আর অফিস, গাজীপুর সদর , গাজীপুর মোবাইল: +8809696043755 ই-মেইল: GazipurLandSurvey@gmail.com এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।