খাস জমিতে দীর্ঘদিনের ভোগদখল থাকলে কি সাধারণ মানুষ উচ্ছেদ করতে পারে? আইন কী বলে?
বাংলাদেশে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে একটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো—কোনো ব্যক্তি যদি দীর্ঘদিন ধরে খাস জমি ভোগদখলে থাকেন, তাহলে কি কোনো সাধারণ ব্যক্তি বা প্রতিবেশী তাকে উচ্ছেদ করতে পারবেন? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, জমির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলেও কোনো ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে জমি দখলের চেষ্টা করেন অথবা দাবি করেন যে জমিটি খাস জমি হওয়ায় সেখানে বসবাসকারী ব্যক্তির কোনো অধিকার নেই। কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
খাস জমি মূলত সরকারের সম্পত্তি। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ অনুযায়ী যে জমি সরকারের নামে ১ নং খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত থাকে, তা খাস জমি হিসেবে গণ্য হয়। তবে কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে সেই জমি ভোগদখলে থাকলেই তাকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা যাবে না। কারণ বাংলাদেশের আইনে "দখল" (Possession) একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত বিষয় এবং আদালত দখলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক "ক" ব্যক্তি গত ৪০ বছর ধরে একটি জমিতে বসবাস করছেন, গাছপালা রোপণ করেছেন, ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং জমিটি নিয়মিত ভোগদখল করছেন। পরবর্তীতে "খ" ব্যক্তি দাবি করলেন যে জমিটি সরকারী খাস জমি এবং তিনি নিজে গিয়ে "ক"-কে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করলেন। আইন অনুযায়ী "খ" ব্যক্তি এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন না। কারণ খাস জমি উদ্ধারের ক্ষমতা কোনো সাধারণ নাগরিকের নেই; এটি কেবল সরকার বা আইনগতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের।
যদি কোনো ব্যক্তি জোরপূর্বক জমি দখল করেন, ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলেন, ফসল কেটে নেন অথবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কাউকে উচ্ছেদ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও দেওয়ানি উভয় ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী অবৈধ অনুপ্রবেশ (Criminal Trespass), সম্পত্তির ক্ষতিসাধন (Mischief), জোরপূর্বক বলপ্রয়োগ (Criminal Force), দলবদ্ধ হামলা (Rioting) এবং বসতবাড়িতে অবৈধ প্রবেশ (House Trespass) সংক্রান্ত অপরাধে মামলা দায়ের করা সম্ভব।
অন্যদিকে, যিনি উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন তিনি দেওয়ানি আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Temporary Injunction), স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Permanent Injunction) অথবা দখল পুনরুদ্ধারের মামলা দায়ের করতে পারেন। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৯ ধারার নীতি অনুসারে, কোনো ব্যক্তি শান্তিপূর্ণ দখলে থাকাবস্থায় আইনবহির্ভূতভাবে উচ্ছেদ হলে তিনি আদালতের মাধ্যমে পুনরায় দখল ফিরে পাওয়ার অধিকার রাখেন। এখানে মালিকানা নয়, বরং উচ্ছেদের পূর্বে তিনি বাস্তবে দখলে ছিলেন কি না, সেটিই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে খাস জমিতে দীর্ঘদিন দখলে থাকলেই মালিকানা সৃষ্টি হয়ে যায়। যদি সরকার প্রমাণ করতে পারে যে জমিটি প্রকৃতপক্ষে খাস জমি এবং কোনো বৈধ বন্দোবস্ত, লিজ বা মালিকানার দলিল নেই, তাহলে সরকার আইনানুগ প্রক্রিয়ায় উচ্ছেদের ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু সেই উচ্ছেদও যথাযথ প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই করতে হবে।
ধরা যাক, এস.এ রেকর্ডে একটি দাগের অংশ সরকারী খাস জমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত ছিল। পরে আর.এস জরিপে নকশাগত ভুলের কারণে খাস জমির কিছু অংশ পাশের ব্যক্তিগত দাগে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। বহু বছর ধরে ব্যক্তি সেই অতিরিক্ত অংশ ভোগদখল করছেন। এ অবস্থায় কোনো প্রতিবেশী ব্যক্তি এসে তাকে উচ্ছেদ করতে পারবেন না। প্রথমে প্রমাণ করতে হবে জমিটির প্রকৃত অবস্থান, মালিকানা ও রেকর্ডের ইতিহাস কী। প্রয়োজন হলে ডিজিটাল সার্ভে, রেকর্ড যাচাই, নকশা সংশোধন এবং আদালতের মাধ্যমে মালিকানা নির্ধারণ করতে হবে।
অতএব, খাস জমিতে ভোগদখলে থাকা কোনো ব্যক্তিকে সাধারণ জনগণ, প্রতিবেশী বা অন্য কোনো ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে উচ্ছেদ করতে পারেন না। উচ্ছেদের ক্ষমতা কেবল সরকার বা আইনগতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের রয়েছে। আর কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে উচ্ছেদের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, দেওয়ানি মামলা এবং নিষেধাজ্ঞামূলক প্রতিকার গ্রহণ করা সম্ভব। তাই জমি সংক্রান্ত বিরোধে শক্তি বা প্রভাবের পরিবর্তে আইন ও আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করাই সঠিক ও নিরাপদ পথ।


অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url