এস.এ ও আর.এস রেকর্ডের অসামঞ্জস্য: জমির প্রকৃত মালিক কে?
বাংলাদেশে জমি সংক্রান্ত বিরোধের অন্যতম বড় কারণ হলো এস.এ (SA) ও আর.এস (RS) রেকর্ডের মধ্যে অসামঞ্জস্য। অনেক সময় দেখা যায়, এস.এ রেকর্ডে জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর ও মালিকানা একরকম থাকলেও পরবর্তীতে আর.এস জরিপে দাগ বিভাজন, নকশাগত ভুল অথবা মাঠ পরিমাপের অসঙ্গতির কারণে জমির পরিমাণ ও অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যায়। ফলে প্রশ্ন উঠে—প্রকৃত মালিক কে? শুধুমাত্র আর.এস রেকর্ডে নাম থাকলেই কি মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়, নাকি পূর্ববর্তী এস.এ রেকর্ড, দলিল ও বাস্তব দখলও গুরুত্বপূর্ণ?
আইনের দৃষ্টিতে শুধু এস.এ বা আর.এস রেকর্ড এককভাবে মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। বাংলাদেশের আদালত সাধারণত দলিল, CS/SA/RS খতিয়ান, মৌজা নকশা, বাস্তব দখল, মাঠ পরিমাপ, খাজনা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ একত্রে বিবেচনা করে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করেন। খতিয়ানকে “Presumptive Evidence” বা প্রাথমিক/সহায়ক প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়। ফলে আর.এস রেকর্ডে কোনো ভুল থাকলেও সেটি চূড়ান্ত মালিকানা প্রমাণ করে না, আবার এস.এ রেকর্ড পুরাতন হলেও সেটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে গণ্য হয়।
উদাহরণস্বরূপ, এস.এ রেকর্ডে একটি দাগে “ক” ও “খ”-এর নামে যথাক্রমে ১৩২ শতাংশ ও ১৯৮ শতাংশ জমি রেকর্ড ছিল এবং অবশিষ্ট অংশ সরকারী খাস জমি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে আর.এস জরিপে সেই দাগ ভেঙে কয়েকটি নতুন দাগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেল, একটি ব্যক্তিগত দাগে রেকর্ডের তুলনায় অতিরিক্ত জমি পাওয়া যাচ্ছে এবং সরকারী খাস দাগে একই পরিমাণ জমি কমে গেছে। এই অবস্থায় শুধুমাত্র আর.এস নকশা দেখে অতিরিক্ত জমির মালিকানা দাবি করা যাবে না। আদালত তখন পূর্ববর্তী এস.এ রেকর্ড, মূল দলিল, বাস্তব দখল, মাঠ পরিমাপ এবং বিশেষজ্ঞ সার্ভে রিপোর্ট যাচাই করে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করবেন।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ অনুযায়ী খাস জমি সরকারের সম্পত্তি এবং জরিপের ভুলে ব্যক্তিগত দাগে অন্তর্ভুক্ত হলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যক্তিগত মালিকানায় পরিণত হয় না। আবার প্রমাণ আইন, ১৮৭২ অনুযায়ী আদালত নির্ভরযোগ্য দলিল, বাস্তব দখল ও দীর্ঘদিনের ব্যবহারকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেন। তামাদী আইন, ১৯০৮-এর ২৭ ও ২৮ ধারায় দীর্ঘদিনের বৈরী দখলের বিষয় উল্লেখ থাকলেও সরকারী জমির ক্ষেত্রে আদালত সাধারণত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন।
এ ধরনের সমস্যার প্রতিকার পাওয়ার জন্য প্রথমে একজন সনদপ্রাপ্ত সার্ভেয়ার দিয়ে CS, SA, RS ও বর্তমান নকশা মিলিয়ে ডিজিটাল সার্ভে বা পুনঃমাপজোক করানো উচিত। এরপর জরিপগত ভুল প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট অফিস, ভূমি অফিস বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে রেকর্ড ও নকশা সংশোধনের আবেদন করা যায়। প্রয়োজনে দেওয়ানি আদালতে ঘোষণামূলক মামলা (Declaratory Suit), সীমানা নির্ধারণ মামলা (Boundary Suit) অথবা রেকর্ড সংশোধন মামলা দায়ের করেও আইনগত প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। তাই জমির প্রকৃত মালিক নির্ধারণে শুধু একটি রেকর্ড নয়; বরং দলিল, পূর্ববর্তী রেকর্ড, বাস্তব দখল ও আইনগত প্রমাণ—সবকিছুই সমান গুরুত্বপূর্ণ।


অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url