জরিপের ভুলে খাস জমি ব্যক্তিগত দাগে অন্তর্ভুক্ত: কী বলছে আইন?

বাংলাদেশে ভূমি জরিপ ও রেকর্ড সংশোধনের সময় প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটে, যেখানে সরকারী খাস জমির কিছু অংশ ভুলক্রমে ব্যক্তিগত দাগের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। বিশেষ করে এস.এ (SA) থেকে আর.এস (RS) জরিপে দাগ বিভাজনের সময় জরিপজনিত ভুল (Survey Error), নকশাগত ত্রুটি (Map Error), মাঠ পরিমাপে অসামঞ্জস্য অথবা হিসাবগত ভুলের কারণে এই ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়। ফলে খতিয়ানে জমির পরিমাণ একরকম থাকলেও মৌজা নকশা ও সরেজমিন পরিমাপে জমি বেশি বা কম দেখা যায়। এ ধরনের পরিস্থিতি ভবিষ্যতে জমির মালিকানা, দখল, সীমানা, নামজারি এবং সরকারী আপত্তি সংক্রান্ত গুরুতর বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক এস.এ জরিপে ২১১/২৫২ নং দাগে মোট ৭ একর ৩৬ শতাংশ জমি ছিল। এর মধ্যে মনির উদ্দিনের অংশ ১৩২ শতাংশ, নিয়ামত ফকিরের অংশ ১৯৮ শতাংশ এবং অবশিষ্ট ৪০৬ শতাংশ সরকারী ১ নং খতিয়ানে খাস জমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়। পরবর্তীতে আর.এস জরিপে পুরাতন দাগ ভেঙে ৭টি নতুন দাগ সৃষ্টি করা হয়। সেখানে ২৮০ নং দাগে ১২৫ শতাংশ জমি রেকর্ড করা হলেও সরেজমিন পরিমাপে দেখা গেল বাস্তবে ১৪০.৩৬ শতাংশ জমি রয়েছে, অর্থাৎ ১৫.৩৬ শতাংশ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। একই সময়ে সরকারী ২৭৮ নং দাগে ৪০৬ শতাংশের পরিবর্তে মাত্র ৩৮৪.১৮ শতাংশ জমি পাওয়া গেল। অর্থাৎ বাস্তবে সরকারী খাস জমির একটি অংশ ২৮০ নং ব্যক্তিগত দাগের মধ্যে চলে এসেছে। এই অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে—অতিরিক্ত জমির মালিক কে?

আইনের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র নকশা বা বাস্তব পরিমাপে জমি বেশি পাওয়া গেলেই সেই অতিরিক্ত অংশের উপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না। কারণ বাংলাদেশের প্রচলিত ভূমি আইন অনুযায়ী মৌজা ম্যাপ বা নকশা এককভাবে মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; এটি কেবল জমির অবস্থান ও সীমানা নির্দেশক সহায়ক দলিল। অন্যদিকে খতিয়ানও চূড়ান্ত মালিকানার দলিল নয়, তবে এটি দখল ও হিসাব সংক্রান্ত প্রাথমিক প্রমাণ (Presumptive Evidence) হিসেবে আদালতে গুরুত্ব পায়। আদালত সাধারণত দলিল, CS/SA/RS রেকর্ড, বাস্তব দখল, মাঠ পরিমাপ, সীমানা, খাজনা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ একত্রে বিবেচনা করে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করেন।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ (State Acquisition and Tenancy Act, 1950) অনুযায়ী খাস জমি সরকারের সম্পত্তি। ফলে সরকারী জমি জরিপের ভুলে ব্যক্তিগত দাগে অন্তর্ভুক্ত হলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যক্তিগত মালিকানায় রূপান্তরিত হয় না। আবার প্রমাণ আইন, ১৮৭২ অনুযায়ী আদালত বাস্তব দখল ও নির্ভরযোগ্য দলিলকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেন। তামাদী আইন, ১৯০৮-এর ২৭ ও ২৮ ধারায় দীর্ঘদিনের বৈরী দখলের মাধ্যমে মালিকানা অর্জনের বিষয় উল্লেখ থাকলেও সরকারী খাস জমির ক্ষেত্রে আদালত সাধারণত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন এবং শুধু দীর্ঘ দখলের ভিত্তিতে সহজে সরকারী জমির মালিকানা স্বীকৃতি দেন না।

এ ধরনের সমস্যার প্রতিকার পাওয়ার জন্য প্রথমে একজন অভিজ্ঞ ও সনদপ্রাপ্ত সার্ভেয়ার দ্বারা CS, SA, RS, BS খতিয়ান ও বর্তমান নকশা মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সার্ভে করানো অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত জমির প্রকৃত উৎস, সীমানা এবং খাস জমির অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। এরপর যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে জরিপ বা নকশায় ভুল হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট অফিস, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস অথবা জেলা প্রশাসকের নিকট রেকর্ড ও নকশা সংশোধনের আবেদন করা যায়। যদি প্রশাসনিকভাবে সমাধান না হয়, তাহলে দেওয়ানি আদালতে ঘোষণামূলক মামলা (Declaratory Suit), সীমানা নির্ধারণ মামলা (Boundary Suit) অথবা রেকর্ড সংশোধন মামলা দায়ের করে আইনগত প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। আদালত প্রয়োজনে Advocate Commissioner নিয়োগ করে পুনরায় সরেজমিন তদন্ত ও পরিমাপ করিয়ে প্রকৃত মালিকানা ও সীমানা নির্ধারণ করতে পারেন।

অতএব, আর.এস নকশায় ব্যক্তিগত দাগে জমি বেশি দেখা গেলেই সেই অতিরিক্ত অংশের উপর বৈধ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না, বিশেষত যখন তা সরকারী খাস জমি থেকে এসেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই এ ধরনের জটিলতায় আবেগ বা অনুমানের উপর নির্ভর না করে সঠিক সার্ভে, পূর্ববর্তী রেকর্ড যাচাই এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর সমাধান।



এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

গাজীপুর ডিজিটাল ল্যান্ড সার্ভে শেখ শহীদুল ইসলাম স্বপন ঠিকানাঃ এস.আর অফিস, গাজীপুর সদর , গাজীপুর মোবাইল: +8809696043755 ই-মেইল: GazipurLandSurvey@gmail.com এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।