আর.এস নকশায় খাস জমি ব্যক্তিগত দাগে অন্তর্ভুক্ত হলে করণীয়: আইনের দৃষ্টিতে বিস্তারিত আলোচনা
বাংলাদেশে জমি সংক্রান্ত বিরোধের অন্যতম জটিল বিষয় হলো জরিপ ও নকশাগত ভুলের কারণে খাস জমি ব্যক্তিগত দাগের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়া। অনেক সময় দেখা যায়, পূর্ববর্তী এস.এ (SA) জরিপে একটি নির্দিষ্ট দাগ ও তার পরিমাণ সঠিকভাবে রেকর্ড ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে আর.এস (RS) জরিপে সেই দাগ বিভাজনের সময় পাশের সরকারি খাস জমির কিছু অংশ ভুলক্রমে ব্যক্তিগত দাগের মধ্যে চলে এসেছে। ফলে খতিয়ানে জমির পরিমাণ একরকম থাকলেও নকশা ও বাস্তব মাপজোকে জমি বেশি দেখা যায়। এ ধরনের পরিস্থিতি ভবিষ্যতে মালিকানা বিরোধ, সীমানা জটিলতা, নামজারি সমস্যা এবং সরকারি আপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক এস.এ জরিপে একটি দাগে ১২ শতক ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি ছিল এবং তার পাশে কিছু সরকারি খাস জমি ছিল। পরে আর.এস জরিপে দাগ বিভাজনের সময় ভুলক্রমে সেই খাস জমির ৬ শতক ব্যক্তিগত দাগের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ফলে আর.এস নকশা ও বাস্তব মাপজোকে মোট ১৮ শতক জমি দেখা যাচ্ছে, অথচ খতিয়ানে এখনো ১২ শতকই উল্লেখ আছে। এই অবস্থায় অনেকেই মনে করেন, বাস্তবে যেহেতু ১৮ শতক জমি পাওয়া যাচ্ছে, তাই পুরো জমির মালিকানাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
বাংলাদেশের প্রচলিত ভূমি আইন অনুযায়ী, মৌজা ম্যাপ বা নকশা এককভাবে মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। নকশা মূলত জমির অবস্থান, সীমানা ও দাগ নির্দেশ করে; অন্যদিকে খতিয়ান দখল ও হিসাব সংক্রান্ত প্রাথমিক বা সহায়ক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। আদালত সাধারণত দলিল, খতিয়ান, পূর্ববর্তী CS/SA/RS রেকর্ড, বাস্তব দখল, মাঠ পরিমাপ, খাজনা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ একত্রে বিবেচনা করে মালিকানা নির্ধারণ করেন। ফলে শুধুমাত্র নকশায় জমি বেশি দেখানো হয়েছে বলেই অতিরিক্ত অংশের উপর বৈধ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ (State Acquisition and Tenancy Act) অনুযায়ী খাস জমি সরকারের মালিকানাধীন সম্পত্তি। কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন দখলে থাকলেও শুধুমাত্র দখলের ভিত্তিতে সরকারি খাস জমির উপর সহজে বৈধ মালিকানা অর্জন করা যায় না। যদিও তামাদী আইন, ১৯০৮-এর ২৭ ও ২৮ ধারায় বৈরী দখলের মাধ্যমে মালিকানা অর্জনের বিষয় উল্লেখ আছে, সরকারি খাস জমির ক্ষেত্রে আদালত সাধারণত এই নীতি খুব সীমিতভাবে প্রয়োগ করেন। কারণ সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণের বিষয়ে আদালত অধিক সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে থাকে।
এ ধরনের সমস্যায় প্রথম করণীয় হলো একজন অভিজ্ঞ ও সনদপ্রাপ্ত সার্ভেয়ার দিয়ে CS, SA, RS, BS খতিয়ান এবং বর্তমান নকশা মিলিয়ে ডিজিটাল সার্ভে বা পুনঃমাপজোক করানো। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত অংশটি কোথা থেকে এসেছে এবং সেটি আসলেই খাস জমি কি না তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। এরপর যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে জরিপ বা নকশায় ভুল হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস অথবা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে রেকর্ড ও নকশা সংশোধনের আবেদন করা যায়।
যদি প্রশাসনিকভাবে সমাধান না হয় বা সরকারি কর্তৃপক্ষের সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়, তাহলে দেওয়ানি আদালতে ঘোষণামূলক মামলা (Declaratory Suit), সীমানা নির্ধারণ মামলা (Boundary Suit) অথবা রেকর্ড সংশোধন মামলা দায়ের করা যেতে পারে। আদালত তখন দলিল, পূর্ববর্তী রেকর্ড, খাস খতিয়ান, বাস্তব দখল, সার্ভে রিপোর্ট এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই করে সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।
অতএব, আর.এস নকশায় খাস জমি ব্যক্তিগত দাগে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে শুধু বাস্তব মাপজোক বা নকশার উপর নির্ভর করে মালিকানা দাবি করা ঝুঁকিপূর্ণ। সঠিক সমাধানের জন্য আইনগত ও কারিগরি যাচাই, ডিজিটাল সার্ভে এবং প্রয়োজনীয় আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমি বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা কিংবা সরকারি উচ্ছেদের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।


অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url